Saturday, July 11, 2015

Wednesday, May 19, 2010

হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য

কোনো কোনো দিন এমন হয় যে চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। বাইরের পৃথিবী তখন প্রায় কাঁদো কাঁদো। কিন্তু কিছুতেই চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না তোমার। তুমি ভাবছো চোখ খুললেই বুঝি সব ভেস্তে যাবে। গতরাতে যে স্বপ্নটা তুমি দেখতে শুরু করেছিলে সেই কুয়াশামাখা ঘুমের দেশ যেন রক্তে মিশে গেছে। কিছুটা অবান্তর স্মৃতির ভিতর এক নরম আলস্যময় অসুখের অশ্রু ঝলোমলো উপস্থিতি। কী নাম সেই অসুখের ? তুমি তাকে প্রেম বলে ডাকতে পারো। এইবার বোঝা গেল। এই অসুখ হলে চোখ খুলতে ইচ্ছা করে না কারোর। খোলার সামর্থ্যও থাকে না হয়তো। এইসময় বেশ কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হয়। খিদে পাচ্ছে অথচ খেতে ইচ্ছে করছে না। চোখ বুজে শুয়ে রয়েছো, তবু ঘুম আসছে না। পুরনো রুটের বাস গতির লড়াইয়ে গরুর গাড়িকেও হার মানালে, বাসভর্তি লোকজন কন্ডাক্টরের বাপ-বাপান্ত করলেও, ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না তোমার। আর এই বদলে যাওয়া অনুভূতিমালা শব্দের পর শব্দ বুনে দেয় নিজে থেকেই। কোথাও কোনো একটা নদীর জন্ম হয় যেন। এযাবৎকালব্যাপী সমস্ত একা থাকার খড়কুটো সেই জলস্রোতে ভেসে গেল। কবি তারাপদ রায়ের মতো করে বললে-জলের মতো কবিতা। কোথাও কিছু নড়ে উঠলো। স্থির হয়ে থাকা জলরাশি চুপিসাড়ে শিখে নিলো অবদমিত ঢেউ-এর ভাষা। আর এভাবেই আমি বুঝতে পারি, কথার কোনো যোগ্যতা নেই। কবিতা হয়ে ওঠা ছাড়া। ঠিক যেভাবে ঘৃণার ক্লেদমাখানো দূরভিসন্ধিসকল বড়জোর প্রেমে এসে মিশে যেতে পারে। আর অন্য কোথাও যাবার নেই। আর কবিতা ? সে কোথায় গিয়ে মেশে শেষ অবধি ? সে কীভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কবির হাতে ? আদৌ হয় কি ? ইদানিং এই সমস্ত শাণিত প্রশ্নের বালিবিন্দুগুলো জমে জমে পাথর হয়ে গেছে। এই পাথরের গায়ে লেগে আছে পুরনো জলস্রোতের ক্ষতচিহ্ন।
একদিন বিকেলবেলা প্রিন্সেপ ঘাটে নদীর পাশে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন সবেমাত্র আকাশে মেঘের রেখা ফুটে উঠেছে। আর নিচে নদীর জলেও কেমন একটা আনমনা ভাব লক্ষ্য করলাম। তারপর নদীর ক্যানভাসে দেখা গেলো উল্লম্ব এবং অনবরত কিছু জলের ছোঁয়াচ। দ্রুতস্বরে ফিরে আসা হলো প্রিন্সেপ ঘাটের ওই থামবাড়িটির ভিতর। সেখানে তখন অন্ধকারের মাঝে আলো জমে উঠেছে। আদরের আনন্দে থইথই প্রেমের আলো। ওদিকে আমি তখন একা, পড়িমরি প্রাণভয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখছি। মনকে বললাম-শান্ত হও। বললাম, এবার কিছু কবিতা হোক। হতে পারে সেই কবিতা প্রেমের তরঙ্গে ভাসমান কবির নৌকাবিহারের মতো উজ্জ্বল নয়। হয়তো এই কবিতা এক নিঃসঙ্গ কবির ব্যক্তিগত অবক্ষয়ের রঙে সাদাকালো হয়ে আছে। এমনটাও তো হতে পারে এই কবিতালেখক সবেমাত্র নিজের প্রিয় সম্পর্কের বিসর্জন দিয়ে ফিরেছেন। তাই তার কবিতায় প্রেম সরাসরি আসছে না। আসছে একটু বাঁকবদল নিয়ে। ছদ্মবেশে। তুমি হয়তো তাকে প্রেমের কবিতা বলবে না। বলবে-মনখারাপের কবিতা। সে যাই হোক, এটুকু বোঝাই যায়, শুধু প্রেমই কবিতার জন্ম দেয় না। প্রেম ফুরিয়ে যাবার পরে পরে যে অনন্ত শূন্যতা থাকে সেও তো অনবরত কবিতা দিয়ে যায়। আর কবিও ক্রমাগত ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে। শব্দে। ছন্দে। সুরে। যন্ত্রনায়। এবং অতঃপর প্রেমেও।
এক মহান শূন্যতায় জারিত হয়ে আমরা কবিতা লিখতে এসেছি। আমরা মানে আমি, অরিত্র, সঙ্ঘমিত্রা, বিশ্বদীপ, অনিমিখ এবং আরো অনেকে। ২০০০ সালের পরবর্তী নানান সময়ে আমাদের লিখতে আসা। আমাদের লিখতে আসার সময়টাকে বলা হয়েছে-শূন্য দশক। অর্থাৎ আমাদের কবিতা সঙ্গে প্রথম থেকেই একটি শূন্যতাবোধের আকুতি মিশে রয়েছে। আমরা সত্তর দশক দেখিনি। কিংবা যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয় তখনো আমরা হাঁটি-হাঁটি পা-পা। কিন্তু আমরা ৯/১১ দেখেছি। গুজরাত দাঙ্গা। সাদ্দাম হুসেনের ফাঁসি। কৃষাঙ্গ মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেখেছি। বুঝেছি কীভাবে ৩২ বছরের লালকেল্লা অবক্ষয়ের রূপক হয়ে যায়। আবার আমাদের মানসিকতায় মিশে গেছে সাইজ জিরো-প্রবণতা। বিনির্মান কখনো সখনো নির্মানের শিকড়ে মিশে থাকে। সেই কবিতাটার মতোন-
অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মুল্যবান কখনো-সখনো!
( শক্তি চট্টোপাধ্যায় )
কিন্তু তুমি কীকরে বুঝবে, কাকে বলে অপরূপ ভাঙা ? কীভাবে শিলাখন্ড বদলে যায় ভাস্কর্যে ? এখানেই জয়ী হয় মানুষের অদম্য শিল্পবোধ। জেদ। নিউইয়র্ক শহরে টুইন টাওয়ার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পরে ওই জায়গাকে বলা যায় হয়-গ্রাউন্ড জিরো। যেন শূন্য থেকে শুরু করার আপ্রান অভিপ্রায়। এখানে প্রশ্ন হয়, শূন্য আসলে কী ? শূন্য আদতে একটি বৃত্ত। শূন্য মানে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা অসহায় মানুষের কান্নার অভিকর্ষ সুর। যা কিনা বিস্ফোরণে ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নতুন পৃথিবীতে। আর সেই সশব্দ উল্লাসের ভিতর অল্প অল্প নেমে আসছে নরম নৈঃশব্দ্য। যার অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে আমাদের জীবন। আমাদের কবিতা। এও খানিকটা নেশার প্রকোপের মতোন। বেলুন ফেটে গিয়ে রঙ ঢলে পড়ে বিবর্ণ দেওয়ালে। সেই আমুদে আবছায়ায় কবিতার শরীরকথন শুরু হয়। আমরা পরতে পরতে দেখি কীভাবে সেইসব কবিতারা লেখা হয়ে নেমে আসছে সাদা পাতায়। তুমি কখনো ভেবো না যে আমি কবিতা লিখি। আমি হলাম অনুবাদক। যা কিছু কবিতা সবই তো রাখা আছে পৃথিবীর কোণায় কোণায়। আমি শুধু সেই কবিতাগাছে শব্দের পাতা বসাই। আর তোমার ঠোঁটের আলতো হাসি দেখে ছন্দের ফুল ফোটে। তুমি জানো। আমি সারাক্ষণ নেশা করে আছি। একটার কর একটা শব্দ ডিঙিয়ে আমি যেতে চাইছি তোমার কাছেই। তোমার পাশে বসবো বলে। দুহাত পেতে চেয়ে নেবো সমূহ আরোগ্য। তুমি আমার কাছে আসবে না ? ভালোবাসবে না আমাকে ?
একবার এক মেলায় বেড়াতে বেড়িয়েছি। ভালো লাগছিলো না। একঘেয়ে ভিড়ের দেশ। অথচ সেই মানুষের মেলায় কবিতা সম্ভাবনা এলো। অমনি চোখের সামনে সমস্ত মানুষ স্থির হয়ে গেলো। আলোগুলো সব নিভু নিভু। এমন সময় আমার যা হয় তাই হলো। একটা ঘন বিষাদ নেমে এলো মেরুদন্ড বেয়ে। আর শব্দের ভিতরকার কাঁপা কাঁপা সমর্পণ ছুঁয়ে থাকলো স্নায়ুর ভিতর। কবিতা এভাবেই আসে। দুম করে ফেটে বসা অবাধ্য মনখারাপের মতোন। সে কি কাউকে বলে-কয়ে আসে ? কখনোই না। শুধু তার মাথাভর্তি উসকো খুসকো চুল। ঠোঁটে লেগে আছে বিষন্নতা। তবু চুমু খেতে ইচ্ছে করবে তোমার। অসহায় লাগবে। আর সেই কবিতার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ানো মাত্র অসুখ করবে তোমার। শূন্যতার অসুখ। কবি নির্মিত রেখাচিত্র পেরিয়ে সেই কবিতা ছড়িয়ে পড়বে তোমার অন্তরমহলে। হয়ে যাবে তোমারও কবিতা-
তোমাকে অসুখ করেছে আমার কথা ছড়িয়ে কাহিনি হয়ে যাচ্ছে...কথাচ্ছলে শব্দ হাঁপায়, গোঙায়, সিঁধ কাটে...
( পলাশ দে )
পলাশের কবিতার শরীর ছুঁয়ে বলতে হয় শব্দ সিঁধ কাটলে সেই ছিদ্রপথে নেমে আসে প্রেম এবং নৈশঃব্দ্য। যার কোনো ছোবলে হারিয়ে যেতে পারে স্মৃতি এবং স্মৃতির বিস্ময়সূচক চিহ্ন। শব্দবুননে যতটা নিপুন হলে রাত্রির তৃতীয় প্রহরে স্বপ্নের পংক্তি জমা হতে থাকে, তার চেয়েও বেশি অন্ধকার আমি প্রত্যক্ষ করেছি প্রেমের বিরতিতে। সেই মহান কবিতার স্পর্শ পেতে হলে ভালোবাসার নজরানা দিতে হয় মৃত্যুর পেয়ালায়। আমি শুধু সেই আকন্ঠ বিষপানের গন্ধটুকু লিখতে চাই আমার খাতায়। ডায়রিতে। কিন্তু কিছুতেই সেই ছোঁয়াচটুকু তুলে আনতে পারিনা শব্দের শরীরে। তখন চুপ করে যেতে হয়। কথা বলার মতো কোনো শব্দ অবশিষ্ট থাকে না। মানে আবার সেই নৈঃশব্দ্য। শব্দ আর নৈঃশব্দ্যের মাঝখানে যেটুকু বিরতি, সেই ফাঁকে ঢুকে পড়ে প্রেম। আমৃত্যু নিয়ম ভেঙে আসা এক অবদমিত অবাধ্য প্রেম।
এমন কে আছে বলো শব্দের ঈশ্বরে যাবে জীবনে সর্বস্ব খোয়াবে না
( শঙ্খ ঘোষ )
ওদিকে আমার ঈশ্বর বিস্মৃতির মগডালে চড়ে বসেছেন। অভিমান হয় আমার। সর্বস্ব খুঁইয়ে প্রেমে পড়াটা বাতুলতা। এমনটাই মনে হবার কথা ছিলো আমার। কিন্তু আজো আমি টের পাই ঠোঁট নাড়ার অস্ফুট শব্দ। চুম্বনের স্বরধ্বনি। আমি কি উদাসীন এতো যে তোমার ভালোবাসাকে বুঝতে ভুল হবে! অথচ আমারও তো বারবার ভুল হয়ে যায়। আমি তো বুঝে গেছি ঠোঁট না কাটলে বোঝাই যায় না রক্তের আসল স্বাদ কীরকম। তাই নৈঃশব্দ্য আসে শব্দকে ভাষা দেবার জন্য।
মাঝেমাঝে রাত্রির অন্ধকার ফনা তুলে ভয় দেখায় আমাকে। আমি লোডশেডিং-এর ছোবলে ঠান্ডা জিভ ঠেকিয়ে দেখেছি মরে যাওয়া সাপেরাও কখনো সখনো স্বপ্নে এসে হিস হিস ফাঁদ পেতে রাখে। আমার শব্দভয় হয়। শরীর ক্রমশই কাতর হয়ে পড়ে। আর সেইমুহূর্তে তুমি আসো। ঠোঁট রাখো আমার ক্ষতে। আমার সমস্ত কবিতা সম্ভাবনা পুনরায় যৌনকাতর হয়। সংক্রামিত জীবানুর মতোন। শূন্য। ভারমুক্ত। কবিতাই হয়ে ওঠে সমগ্র নিরপেক্ষ মনের নির্ভয় রাজনৈতিক আশ্রয়। শেষ অবধি এতো এতো কঠিন কথার আলস্যে ঘুম পায়। অন্ধকার পেরিয়ে আসা নিরাপদ ঘুমের মুগ্ধ নিরাময়।
ধ্বংসস্তূপ বলতে কী বোঝো তুমি ? সাইজ জিরো। নষ্ট পেয়ালায় তীক্ষ্ণ শীৎকার। আমি বলি কি, শপথ নেবার সময় হয়েছে এবার। আমি অরিত্রকে বলি, বিশ্বদীপকে বলি, অনিমিখকে বলি, এটাই আসল ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। সঙ্ঘমিত্রাকে বলি, পাশে এসে দাঁড়া। এবার কিছু কবিতা হোক। শূন্য থেকে শুরু হোক অনর্গল বিপ্লব। তুমি জানো, আমি আজকাল স্পষ্ট দেখতে পাই, আমাদের কবিতা জমে উঠছে। বিসর্জন সেরে ফেলা সমস্ত কবির পরবর্তী উৎসব আলোয় ভরে উঠলো। আমি এইমাত্র দেখলাম, নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার মাথা তুলে দাঁড়ালো। আমি বুঝতে পারলাম ধাক্কা খেতে খেতে, আঘাত আঘাত সইতে সইতে একটা দশক, আমাদের শূন্যদশক ঘুরে দাঁড়াতে শিখে গেছে। আর পাল্টা আঘাত পেয়ে নিজেকে শুধরে নিচ্ছেন মহাকাল। কে না জানে শূন্যই সূত্রপাত। শূন্যের পরেই থাকে মহার্ঘ্য সংখ্যাসরণী। তারই বিভিন্ন ধারাপাতে ছিটকে আসে বিষাদ, মোহ, অন্ধকার, প্রেম। শূন্যের ভিতর এখন এতসব ঢেউ নামে। তুমি তাকে স্বপ্ন বলে ডাকতে পারো।
কোনোকোনো দিন এমন হয় যে চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। চোখ খুললেই যেন সব ভেস্তে যাবে!
( ঋণ - শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, মন্দাক্রান্তা সেন, অরিত্র সান্যাল, অর্পিতা চৌধুরী )